সাতক্ষীরায় ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয় করেও নিরসন হয়নি জলাবদ্ধতা

৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয় – সাতক্ষীরায় খাল রয়েছে প্রায় ৪২৯টি। এসব খাল দিয়ে পৌরসভা ও উপজেলা শহরের পানি নিষ্কাশন হয়। তবে দখল-দূষণে অধিকাংশ খালের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। এ কারণে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকাসহ তিন উপজেলায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ২০২২ সা‌লে ৪৭৬ টাকা ব‌্যয়ে নদী ও বদ্ধ খাল পুনঃখনন প্রকল্প নেয়া হলেও নিরসন হয়নি জলাবদ্ধতা।

 

সাতক্ষীরায় ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয় করেও নিরসন হয়নি জলাবদ্ধতা

পৌরসভার বাসিন্দারা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে ও সরকারি খালগুলো দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মৎস্য ঘের। ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন না হয়ে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে থাকে মাসের পর মাস। পৌর এলাকাসহ তিন উপজেলার কমপক্ষে লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি। বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে থাকায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এলাকাবাসী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শহরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ও নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে একটি প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০২২ সা‌লে নেয়া প্রকল্পে ব্যয় হয় ৪৭৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের অধীনে সাতক্ষীরা সদ‌রের বেতনা, ম‌রিচ্চাপ, আশাশু‌নির ক‌পোতাক্ষ, শ‌্যামনগ‌রের ছোট যমুনাসহ জেলার শতা‌ধিক বদ্ধ খাল পুনঃখননকাজ চলমান। তবে নদী খন‌নের শুরু‌তে অনিয়মের অভি‌যোগ তোলেন নদীপা‌ড়ের বাসিন্দারা। তাছাড়া বেতনা নদীর খনন বন্ধ রয়েছে। খাল খন‌নেও কো‌নো সুফল মিলছে না বলে দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

 

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সালাউদ্দিন জানান, প্রকল্পটির ৭৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইমলাম জানান, তার অধীনে থাকা কাজের ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। খননকাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে বলে আশা করছেন তারা।

গতকাল সাতক্ষীরা শহরের কয়েকটি এলাকা ও তিনটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বাড়িঘরে পানি উঠেছে। টিউবওয়েলগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। অনেকে পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভাড়া বাসায় দিন কাটাচ্ছে। চার মাস ধরে নোংরা পানিতে চলাফেরা করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এ কারণে অনেকের চর্মরোগও দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পৌরসভার রাজার বাগান, ইটাগাছা, কামালনগর, বদ্দিপুর, তালতলা, উত্তর কাটিয়া, মাগুরা, মাঠপাড়া, মুনজিতপুর, গড়েরকান্দা, সুলতানপুর, রথখোলা, রাজারবাগান, কুখরালীতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া সদর উপজেলার লাবসা, গোপীনাথপুর, ধুলিহর, শ্যাল্যে, মাছখোলা, ফিংড়ি, ব্রহ্মরাজপুর, ঝাউডাঙ্গা, বল্লীসহ আশাশুনি ও কলারোয়া উপজেলার অন্তত ৪০ গ্রাম জলাবদ্ধ রয়েছে। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, নদী ও খাল খননে অনিয়মের কারণেই জেলার একটি বড় অংশ প্রতি বছর পানিতে ডুবে থাকছে।

পৌরসভার রাজার বাগান এলাকার বাসিন্দা আল-আমিন জানান, চার মাস ধরে তার বসতবাড়ি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। নিয়মিত নোংরা পানিতে চলাফেরা করার কারণে চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। তাছাড়া রান্নাসহ অন্যান্য কাজে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নারীদের। পৌরসভার সব ধরনের কর পরিশোধ করার পরও পানি নিষ্কাশন বা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

কথা হয় একই এলাকার দুই স্কুলছাত্রী মামনি বিশ্বাস ও মোহনা আক্তারের সঙ্গে। তারা জানায়, প্রতিদিনই কাদাপানির মাঝ দিয়ে পল্লীমঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাদের। শুধু তারাই নয়, নিকটবর্তী মাছখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্যান্য স্কুল-কলেজের দুই-তিন হাজার শিক্ষার্থী পানির মধ্য দিয়ে যাতয়াত করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না।

অপরিকল্পিত বাঁধ দিয়ে চিংড়ি ঘের তৈরি, নদীর বাঁধ ছিদ্র করে পানি উত্তোলন ও স্লুইসগেট নির্মাণ জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সচেতর নাগরিকরা। তবে জলাবদ্ধতার কবল থেকে সাতক্ষীরাকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেন তারা। না হলে প্রতি বছর জলাবদ্ধতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে উপকূলীয় এ জেলা।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জেলায় কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ সরাসরি পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এর মধ্যে স্থায়ী বা শুষ্ক মৌসুমে লক্ষাধিক মানুষ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। অধিকাংশ খালে পানি নিষ্কাশন বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন সময় কিছু খাল ইজারাও দেয়া হয়েছে।

এসব খাল উদ্ধার করে সরকার খননের উদ্যোগ নিলেও শতভাগ সফলতা আসেনি। এ কারণে জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না। আশাশুনি ও সদর উপজেলা দিয়ে বয়ে চলা বেতনা, মরিচ্চাপ ও কপোতাক্ষ নদ পুনঃখননেও কোনো কাজে আসেনি। এসব নদী ও খাল যদি সঠিকভাবে খনন করা যেত তাহলে মানুষ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ত না।’

সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক নদী বা খালের নেটপাটা তুলে দেয়ার পর জলাবদ্ধতা বেশ কমে গেছে। তাছাড়া বেতনা ও প্রাণসায়ের খালের খননকাজ শেষ হলে আগামীতে জলাবদ্ধতা থাকবে না।’

Leave a Comment